জাল টাকার নামে অভিনব প্রতারণা

Total Views : 105
Zoom In Zoom Out Read Later Print

ঢাকা প্রতিনিধি

জাল টাকার নামে অভিনব প্রতারণা 


জনাব মকবুল সাহেব (ছদ্ম নাম) অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা,  ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি। বিভিন্ন সময় মাদ্রাসা ও এতিমখানার  জন্য টাকা দেন। মকবুল সাহেবের ভাতিজা শিক্ষক স্কুলের। সকাল ৯.০০ টা থেকেই ক্লাসে খুব ব্যস্ত থাকেন। মকবুল সাহেব  মাদ্রাসা ও এতিমখানার জন্য  একটা বিকাশের দোকান হতে বিকাশ এজেন্টে এর মাধ্যমে ভাতিজাকে টাকা পাঠালেন।  এজেন্ট মকবুল সাহেবের দেয়া নাম্বারে টাকা ক্যাশইন করে দিল এবং মকবুল সাহেব ভাতিজাকে ফোন করে জেনে নিলেন সেও টাকাটা পেয়েছে। এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল। গোলমালটা বাধলো এর ২ ঘন্টা পর। শিক্ষক ভাতিজা ব্যস্ত মানুষ সকাল থেকেই ক্লাসে শিক্ষার্থীদের পড়ান, বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির মিটিং চলছে গুরুত্বপূর্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এরই মধ্যে কল আসলো দোকানদার পরিচয় দিয়ে। নামসহ কলার বললো আপনি কি হোসেন সাহেব  (ছদ্ম নাম) বলছেন। আমি বিকাশের এজেন্ট (দোকানদার) বলছি আপনাকে কিছুক্ষন পূর্বে ১০২০০/- টাকা যে দাড়িওয়ালা (মকবুল সাহেব ধর্মপ্রান লোক ইসলামী সুন্নতি দাড়ি তিনি রেখেছেন) লোকটা টাকা পাঠালো তিনি আপনার কে হন? তিনি যে টাকাটা আমাকে দিয়েছে সেটার মধ্যে ১ টি জাল নোট ছিল। আমি পুলিশে কমপ্লেইন করেছি এবং বিকাশ অফিসে জানিয়েছি, তারা আপনার অক্যাউন্ট বন্ধ করে দিবে সম্ভাবত। বিকাশ অফিস থেকে ফোন দিলে একটু কথা বলেন। হোসেন সাহেবের বিকাশে মোটামোটি সব সময়ই কিছু টাকা থাকে। বিভিন্ন লোকজন মাদ্রাসা ও এতিমখানার জন্য ওনাকে টাকা পাঠায়। তিনিতো পরে গেলেন চিন্তাতে কি করা যায়  বিকাশের টাকাগুলোতো খুব জরুরী। এসব ভাবার কিছুক্ষনের মধ্যেই একটি নাম্বার হতে হোসেন সাহেবের নিকট ফোন আসলো।  ফোন ধরার সাথে প্রতারক বলা শুরু করলো-  আমি বিকাশ অফিসের কম্পলেইন শাখা হতে জাহিদ বলছি। আপনার অ্যাকাউন্টে যে ১০২০০/- টাকা দাড়িওয়ালা লোকটি টাকা পাঠিয়েছিল সেই বিষয়ে দোকানদার বিকাশ অফিসে অভিযোগ করেছেন আমরা আপনার বিকাশ অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিবো। আপনি কি আপনার অ্যাকাউন্ট চালু রাখতে চান। এতিমখানা ও মাদ্রাসার খরচের  টাকা, ঐগুলোতো খুব জরুরী; হোসেন সাহেব পরে গেলেন চিন্তায়। দোকানদার আগে ফোন দিলো আবার বিকাশ অফিস থেকে ফোন দিচ্ছে, টাকার অংকও সঠিক আছে এতে হোসেন সাহেব মনে করলেন সত্যিই বিকাশ অফিস হতে ফোন দিয়েছে।  এদিকে প্রতারক চক্রের কথার মারপ্যাচে পিন নাম্বারের সাথে সংখ্যা যোগ বিয়োগ করিয়ে কৌশলে পিন নাম্বার ও ওটিপি নিয়ে নিয়েছে। প্রতারকেরা হোসেন সাহেবকে কথার মাঝে ব্যস্ত রাখছেন ওদিক থেকে তাদেরই আরেক  সদস্য হোসেন সাহেবের দেয়া পিন নাম্বার ও ওটিপি দিয়ে বিকাশ অ্যাকাউন্ট হতে টাকা সরিয়ে নিচ্ছে।  কথার মধ্যেই হোসেন সাহেবের বিকাশ হতে সকল টাকা মুহুর্তের মধ্যে অন্য অ্যাকাউন্টে চলে গেল।  বিকাশ অফিসের নাম করে ফোনকারী হোসেন সাহেবকে বিকাশ অ্যাকাউন্ট চেক করে  দেখতে বলে ফোন কেটে দিল। এদিকে প্রতারকরা পিন পরিবর্তন করায় হোসেন সাহেব তার অ্যাকাউন্ট এ ঢুকতে পারছে না। তিনি পরলেন খুব বিপদে অ্যাকাউন্টে অনেকগুলো টাকা আছে তাও নিজের টাকা নয় গরীবের হকের টাকা। তিনি কলব্যাক করলেন বিকাশ অফিস পরিচয় দেয়া নাম্বারে জানালেন তার অ্যাকাউন্ট ঠিক হয় নাই। অ্যাকাউন্ট ঠিক করা জরুরী। প্রতারকরা তার সরলতার সুযোগ সুযোগটায় গ্রহণ করলো,  জানালো -আপনি যদি তাদের দেয়া নাম্বারে ক্যাশ ইন করে দেন তাহলে আপনার অ্যাকাউন্টটি ঠিক হবে এবং অ্যাকাউন্ট ঠিক হলে ঐ টাকাটা আপনার অ্যাকাউন্টে যোগ হয়ে যাবে। হোসেন সাহেবের বিকাশ অ্যাকাউন্ট চালু করা খুব জরুরী। তিনি সরল বিশ্বাসে প্রতারকদের দেয়া ৪টি নাম্বারে পাঠিয়ে দিলেন ১২০,০০০/- টাকা। কিছুক্ষন পর আপনাকে আপডেট জানানো হবে বলে কল কেটে দিল প্রতারক চক্র। ১০ মিনিট যায়, ২০ মিনিট যায় হোসেন সাহেবের অ্যাকাউন্ট আর ঠিক হয় না। তিনি চিন্তায় পরে গেলেন। ফোন করলেন বিকাশ অফিসের কর্মী পরিচয় দেয়া নাম্বারে কিন্তু নাম্বার বন্ধ। হোসেন সাহেবেরতো মাথায় হাত। হায় এখন কি করি। অ্যাকাউন্টের টাকাতো গেলোই আবার নিজে থেকে তাদের দেয়া নাম্বারে টাকা দিয়ে দিল। নিজের ভুলের জন্য খুব অনুশুচোনা হলো তার। সাম্প্রতিক সময়ে এমনি একটি বিকাশ প্রতারনার ঘটনার  মামলা তদন্ত করেছে  ডিএমপি, ঢাকার সিটি- সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগ। তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় ই-ফ্রড টিমের সদস্যরা ২ জন প্রতারককে গ্রেফতার করে। তাদের নিকট হতে অন্যের নামে রেজিস্ট্রেশন করা কয়েকটি বিকাশ অ্যাকাউন্ট যুক্ত সিমকার্ড জব্দ করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে অভিনব কিছু তথ্য পাওয়া যায়। তারা জানায় যে- তারা বিভিন্ন বিকাশের দোকানে ঘুরে ঘুরে মিনিট কার্ড কেনা কিংবা বিকাশে ক্যাশ ইন করার নাম করে তাদের ফোনে থাকা সিক্রেট ক্যামেরা (যা মোবাইলে স্ক্রীন বন্ধ থাকা অবস্থায়ও ভিডিও কিংবা ছবি তোলে) ব্যবহার করে ক্যাশ ইন রেজিস্টারের ছবি তোলে এবং উক্ত ছবি তাদের সহযোগীদের হটসঅ্যাপের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয় এবং কোন জায়গার ছবি সেটা বলে দেয়। সেই প্রাথমিক তথ্য পেয়ে তাদের অন্য সদস্যরা কথার বিভিন্ন মারপ্যাচে সাধারন জনগনকে বোকা বানিয়ে বিকাশের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। গ্রেফতারকৃতদের দেয়া তথ্যতে জানা যায় বিকাশ প্রতারনার কাজে তাদের একেকটি দলে রয়েছে ২০ থেকে ২৫ জন লোক। কেউ ক্যাশ ইনের রেজিস্টার ছবি তুলে দেয়, কেউ কল করে, কেউ টাকা এক নম্বর থেকে আরেক নম্বরে ট্যান্সফার করে আবার কেউ ক্যাশ আউট করে। কেউ বেনামী রেজিস্ট্রেশন করা সিম সংগ্রহ করে। সর্বপ্রথম শুরু হয় বেনামী সিম ও বিকাশ রেজিস্ট্রেশন হতে তার পরের ধাপ হচ্ছে বিকাশের ক্যাশ ইন রেজিস্টারের ছবি তোলা আর সর্বশেষ ধাপ হচ্ছে প্রতারনার টাকা ক্যাশ আউট করা। বিকাশ প্রতারনা প্রতিরোধের জন্য সবচেয়ে যেটা প্রয়োজন তা হচ্ছে সতর্কতা। বিকাশ অফিস থেকে কখনো গ্রাহকের পিন কোড চাওয়া হয় না। বিকাশ প্রতারনা প্রতিরোধে বিকাশের এজেন্ট ব্যবসায়ীরা গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিটা ক্যাশ আউটের ক্ষেত্রে বিকাশ অফিস কর্তৃক প্রদত্ত নীতিমালা মেনে চললে বিকাশ প্রতারনা অনেকাংশে কমে যাবে,  সেই সাথে ক্যাশ ইন রেজিস্টেন সতর্কতার সাথে সংরক্ষন করলে প্রতারক চক্র আর ছবি তুলতে পারবে না।  উপরোক্ত বিকাশ প্রতারনার ঘটনায় ২ জন আসামীকে ঢাকা হতে গ্রেফতার করে বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করা হয়। প্রতারক চক্রের অন্যান্য সদস্যদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান অব্যাহত আছে। 


# সচেতনতায় পারে আপনাকে প্রতারণার হাত থেকে বাঁচাতে।

See More

Latest Photos