এশিয়া কাপে চ্যাম্পিয়ন নারী ক্রিকেট দল

Total Views : 15
Zoom In Zoom Out Read Later Print

নজরুল ইসলাম ।। এ যেন রূপকথাকেও হার মানানো। কখনো কখনো কিছু কিছু ঘটনা হার মানায় কল্পনাকেও। বাস্তবতার জমিনে নামিয়ে আনে কল্পনার ফানুসকে। তেমনই একটি রূপকথার জন্ম দিল বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল। সামনে মহা পরাক্রমশালী ভারত। যে দলটি এশিয়া কাপের ৬টি আসরের সবকটিতেই চ্যাম্পিয়ন। শুধু তাই নয় গত ছয় আসরে তাদের কখনোই স্পর্শ করতে পারেনি কোনো পরাজয়। তেমনই একটি দলকে হারিয়ে দিয়ে ইতিহাস রচনা করল বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল। এশিয়া কাপের ফাইনালে তিনবার খেলেছে বাংলাদেশ পুরুষ ক্রিকেট দল। বরাবরই হতাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে। পরাক্রমশীল ভারতকে হারিয়ে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটাররা জিতে নিয়েছে এশিয়া কাপ ট্রফি। শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালে ভারতকে ৩ উইকেটে হারিয়ে বাংলার বাঘিনীরা জিতে নিয়েছে প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফি।

ব্যর্থতার ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে কিভাবে বিজয়ের গান গাইতে হয় তাই যেন দেখাল সালমারোমানাখাদিজারা। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বিধ্বস্ত হয়ে আসা নারী দল মাত্র কদিনের প্রস্তুতি নিয়ে মালয়েশিয়া গিয়েছিল এশিয়া কাপ খেলতে। সেখানেও প্রথম ম্যাচে শ্রীলংকার বিপক্ষে বাজে হার দিয়ে শুরু। এরপর যেন পণ করেই ফেলল বাংলাদেশের নারীরা আর হার নয়। এবার কেবলই সামনে যেতে হবে। পেছনে ফিরে তাকাবনা। যেমন কথা তেমন কাজ। আর পেছনে ফিরে তাকায়নি সালমারা। একে একে চার ম্যাচে জিতে জায়গা করে নেয় ফাইনালে। দারুণ ছন্দে তখন সালমারা। অপরদিকে একেবারে আহত সিংহ ভারতের নারী ক্রিকেটাররা। গ্রুপ পর্বে হারের প্রতিশোধ নিয়ে টানা সপ্তম শিরোপা জয়ের লক্ষ্য মিতালী রাজ,হারমানপ্রিতঝুলন গোস্বামীদের। কিন্তু সবকিছুতে জল ঢেলে দিয়ে ইতিহাস রচনা করে টাইগার নারীরা। গ্রুপ পর্বে ভারতের নারীরা ১৪০ রান করেছিল। কিন্তু ফাইনালে সে পর্যন্তও যেতে দেয়নি বাংলাদেশের নারীরা। আটকে দেয় ১১২ রানে।

রোমানাখাদিজাসালমাজাহানারাদের বিষ মাখা বোলিং এর পর শামিমাআয়েশানিগাররোমানার দুর্দান্ত ব্যাটিং বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের আকাশে উদিত হয় নতুন সূর্য। মিতালী রাজের মত বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যানের ব্যাট ঢাল হতে পারেনি রোমানাসালমাদের ঘূর্ণির সামনে। তেমনি ঝুলন গোস্বামীর মত বিশ্ব সেরা বোলারের বলকে সীমানার বাইরে আঁছড়ে ফেলেছেন শামিমাআয়েশারা। পরিণতি ভারতের প্রতিশোধের আগুণে আরো একটু তেলের ছিটা দিয়ে ট্রফি নিয়ে উচ্ছ্বাসে মাতে টাইগার নারীরা। মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের কিলাত কিলাব মাঠে আজ থেকে ২১ বছর আগে বাংলাদেশের ক্রিকেটের নতুন সূর্য উদিত হয়েছিল আইসিসি ট্রফি জয়ের মধ্য দিয়ে। আর গতকাল সেই কুয়ালালামপুরের কিনরারা ওভালে আরো একবার নতুন সূর্যের উদয় হলো নারী দলের এশিয়া কাপ জয়ের মধ্য দিয়ে।

ম্যাচের শুরু থেকেই বাংলাদেশের রাজত্ব। টস জয় দিয়ে শুরু সালমার। এরপর সবকিছুই টাইগার নারীরা যেভাবে চেয়েছে ঠিক সেভাবেই হয়েছে। মান্দানাকে রান আউট করে সালমার শুরু। এরপর মিতালী রাজ, দীপ্তি শর্মা, অনুজা পাতিলদের উইকেটে দাঁড়াতেই দিলেননা রোমানাখাদিজারা। মাঝখানে অধিনায়ক হারমানপ্রিত কাউর দাঁড়িয়ে গেলেন দেওয়াল হয়ে। তাকে রেখে অপর প্রান্তে আর কাউকে দাঁড়াতে দেননি অন্য কোন ব্যাটসম্যানকে। অধিনায়ক হারমানপ্রিতের ৫৬ রানের ইনিংসটা না হলে অর্ধ শতকেই থেমে যেতে হয় ভারতকে। বাকিদের মধ্যে তিনজন কেবল দুই অংকে যেতে পেরেছে। যাদের মধ্যে আবার সর্বোচ্চ ১১ রান। বাংলাদেশের তিন ঘুর্ণি বোলার শেষ করে দেন ভারতকে। তারা হলেন সালমা, খাদিজা এবং রোমানা।

লিগ পর্বের ম্যাচে এই ভারতের দেওয়া ১৪০ রান তাড়া করে জিতেছিল বাংলাদেশ। এবার ফাইনাল। লক্ষ্য আরো অনেক কম। মাত্র ১১৩। কিন্তু যেহেতু ম্যাচটা ফাইনাল, তাই চাপটা একটু বেশি। তারপরও টাইগারদের দুই ওপেনার শামিমা আর আয়েশার শুরুটা একেবারে সাবলীল। ৩৫ রান তুলে নেন এ দুজন একেবারে দ্রশুত গতিতে। কিন্তু এক ওভারে পরপর দুই বলে দুজনকেই ফিরিয়ে দেন পুনম যাদব। এই পুনম যাদব যা একটু ভুগিয়েছে টাইগার নারীদের। এই স্পিনার চারটি উইকেট তুলে না নিলে জয়টা হয়তো আরো সহজ হয়ে যেতো টাইগারদের জন্য। তারপরও ফারহানা, নিগার সুলতানা আর রোমানার বাংলাদেশকে রেখেছিল জয়ের পথেই। কিন্তু শেষের দিকে এসে হঠাৎ করে পেন্ডুলামের ঘোড়ার মত দুলতে থাকে ম্যাচের ভাগ্য। আর শেষ ওভারে এসে যা রূপ নেয় একেবারে স্নায়ু যুদ্ধে। শেষ ওভারে জয়ের জণ্য বাংলাদেশের দরকার পড়ে ৯ রানের। এমন অবস্থায় সাকিবতামিমরা ফিরেছেন খালি হাতে একাধিকবার। যার সবশেষ উদাহরন মাত্র কদিন আগে ভারতের মাটিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে। তাহলে কি সালমারোমানারাও সে পথে হাটবে? আরো একবার কি তাহলে তীরে এসে তরী ডোবার হতাশায় পুড়তে হবে। তেমন জল্পনা আর কল্পনা যখন চলছিল তখন বল হাতে এলেন ভারতের অধিনায়ক মানপ্রিত কাউর। প্রথম বলে সানজিদা নিলেন এক রান। পরের বলে রোমানা মারলেন চার। চার বলে তখন দরকার চার রান। পরের বলে রোমানা নিলেন এক রান। পরের বলে আউট হয়ে গেলেন সানজিদা। আবার বাড়ছে বল আর রানের ব্যবধান। আর বাড়ছে বাঙ্গালীর হৃদ কম্পন। সে হৃদ কম্পনকে আরো বাড়িয়ে দিলেন দুর্দান্ত খেলা রোমানা। পঞ্চম বলে এক রান নিলেও ফিরে গেলেন রান আউট হয়ে। শেষ বলে দরকার দুই রান। উইকেটে তখন অধিনায়ক সালমা এবং জাহনারা আলম। হৃদ কম্পনের ঢেউটা কুয়ালালামপুর থেকে আঁছড়ে পড়ছে বাংলাদেশেও। শেষ বলটাকে অন সাইডে খেললেন জাহনারা। একরান নেওয়ার পর ছুটলেন আরেক রানের জন্য। বল ফিরে আসার আগে ডাইভ দিয়ে পৌছে গেলেন ক্রিজে নিরাপদে। রচিত হয়ে গেল ইতিহাস। উল্লাসে মতোয়ারা তখন কিনরারা ওভালের হাজার খানেক বাঙ্গালী আর এ দেশের কোটি কোটি ক্রিকেট প্রেমী। শেষ বলের নাটকীয়তায় অজেয় ভারতকে হারিয়ে বাংলাদেশের নারীরা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে রচনা করলেন নতুন ইতিহাস। টাইগার অল রাউন্ডার রোমানা আহমেদ জিতলেন ফাইনাল সেরার পুরষ্কার। কদিন আগে ভারত থেকে একরাশ হতাশা নিয়ে ফিরেছিলেন সাকিবতামিমরা। আর ঈদের মাত্র কদিন আগে মালয়েশিয়া থেকে ঈদ উপহার নিয়ে ফিরলেন সালমারোমানাখাদিজারা।

See More

Latest Photos